২০২৪ সাল

এক দশকের গড়কে ছাড়িয়ে গেছে বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধি

কভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দিকে এগোচ্ছে, যা শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়েছে।

কভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক দেশ অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের দিকে এগোচ্ছে, যা শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদন ও নির্মাণ খাতে চীনের সক্রিয়তা এবং উদীয়মান অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি এতে ভূমিকা রেখেছে। এর সঙ্গে রয়েছে গরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিদ্যুতের চাহিদা। যার নগদ প্রভাব দেখা গেছে ২০২৪ সালের বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবহারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির (আইইএ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, গত বছর বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদা বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা এক দশকের গড়ের তুলনায় বেশি। খবর আরব নিউজ।

২০১৩-২৩ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার বার্ষিক গড় বৃদ্ধি ছিল ১ দশমিক ৩ শতাংশ। এ ১০ বছরের গড় চাহিদাকে ছাড়িয়ে গেছে ২০২৪ সাল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। গত বছর বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ ব্যবহার ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ১০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বা ৪ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ার কারণ হিসেবে উষ্ণায়নের ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, শিল্প-কারখানা, পরিবহনে বিদ্যুতায়ন, ডাটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্প্রসারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইইএর নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরলের ভাষ্যে, বিশ্বব্যাপী নিশ্চিতভাবে বিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিষয়টি সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদাকে প্রভাবিত করছে। উন্নত দেশগুলোয় কয়েক বছর ধরে জ্বালানি খরচ কমার যে প্রবণতা ছিল, সেটিও এখন বদলে যাচ্ছে।

গত বছর জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির দেখেছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বেড়েছে ২৮ শতাংশ, কয়লা ১৫, জ্বালানি তেল ১১ ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ ৮ শতাংশ। এ বছর নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামোর বিকাশ রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছে। এ খাত থেকে যোগ হয়েছে ৭০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ, যার ৮০ শতাংশই সৌরশক্তি থেকে আসা। এর পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি।

উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হিসেবে ফাতিহ বিরল জানান, জ্বালানি ব্যবহার বাড়লেও কার্বন নিঃসরণের হার কমতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালে সব ধরনের প্রধান জ্বালানি ও জ্বালানি প্রযুক্তির চাহিদা বেড়েছে, যার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সবচেয়ে বেশি, তার পরে প্রাকৃতিক গ্যাস। সৌর, বায়ু, পারমাণবিক শক্তি ও বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনের শক্তিশালী সম্প্রসারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কার্বন নিঃসরণের মধ্যে সংযোগ ক্রমে শিথিল করছে।’

গত বছর বৈশ্বিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন তিন দশকের মধ্যে পঞ্চম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তখন পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ১০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বেড়েছে।

জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আইইএ জানিয়েছিল, ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ২০৩০ সালের মধ্যে পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিকাশে বার্ষিক বিনিয়োগ দ্বিগুণ করে ১২ হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করতে হবে। এ খাতের আর্থিক চাহিদা পূরণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে জ্বালানি চাহিদা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে প্রতিবেদনে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধিতে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এখানে জ্বালানির চাহিদা বেড়েছে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। একাধিক অর্থনৈতিক অভিঘাতে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি দেখছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন। তা সত্ত্বেও দেশটিতে জ্বালানি চাহিদা বেড়েছে ৩ শতাংশ। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানির চাহিদা ২ দশমিক ২ ও ইউরোপে দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।

সামগ্রিক চাহিদা বাড়লেও জ্বালানি তেল ও গ্যাস খাতে তুলনামূলক মন্দা দেখা গেছে। গত বছর জ্বালানি তেলের চাহিদা বেড়েছে দশমিক ৮, ২০২৩ সালে যা ছিল ১ দশমিক ৯ শতাংশ। এ প্রথম মোট জ্বালানি চাহিদায় তেলের হিস্যা ৩০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

চলতি বছর জ্বালানি তেলের চাহিদার কমার চিত্র পাল্টে যেতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে পেট্রোলিয়াম রফতানিকারক দেশগুলোর সংস্থা ওপেক। চলতি বছর বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের চাহিদা প্রতিদিন ১০ লাখ ৪৫ হাজার এবং ২০২৬ সালে ১০ লাখ ৪৩ হাজার ব্যারেল বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

২০২৪ সালে জীবাশ্ম জ্বালানির মধ্যে গ্যাসের চাহিদা সবচেয়ে বেড়েছে। আইইএ জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী গ্যাসের চাহিদা ১১ হাজার ৫০০ কোটি ঘনমিটার বা ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে; যা দশকব্যাপী বার্ষিক গড় ৭ হাজার ৫০০ কোটি ঘনমিটারকে ছাড়িয়ে গেছে।

৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে গ্যাস চাহিদা বৃদ্ধির শীর্ষে ছিল চীন, পাশাপাশি অন্যান্য উন্নয়নশীল ও উদীয়মান এশীয় অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের চাহিদা বেড়েছে প্রায় ২ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আইইএ জানিয়েছে, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করায় গত বছর জ্বালানিসংশ্লিষ্ট কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি সীমিত ছিল। বিশ্বব্যাপী কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৩ হাজার ৭৮০ কোটি টনে পৌঁছেছে, যার পেছনে রেকর্ড তাপমাত্রা বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে ২০১৯ সাল থেকে সৌর, বায়ু, পারমাণবিক শক্তি, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ও হিট পাম্পের প্রসার প্রতি বছর ২৬০ কোটি কার্বন নিঃসরণ প্রতিরোধ করছে, যা বৈশ্বিক নিঃসরণের ৭ শতাংশের সমান।

আরও